,



আমি সাম্প্রদায়িক?

মুস্তাফা জামান আব্বাসী 

আমি মুসলিম। এটাই আমার ধর্ম, এটাই আমার পরিচয়। কুরআনের প্রতি বিশ্বস্ত। হাদিসের প্রতি অনুরক্ত। আমাকে শত ভাগে বিভক্ত করলেও এই সত্ত্বাটিই আমার জাগ্রত সত্ত্বা। এর জন্যে মৃত্যুবরণ করা আমার জন্যে শাহাদাতের তুল্য। আমার একজন অনুরক্ত ভক্ত আমাকে সম্প্রতি ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে একটি গাল দিয়েছেন, পর মুহূর্তেই বলেছেন আমার সবকিছুই তার ভাল লাগে, শুধু সাম্প্রদায়িকতা ছাড়া।

আপনাকে খুশি করার জন্যে আমি বলতে পারতাম আমি কোন সম্প্রদায়ের নই, আমি সমস্ত পৃথিবীর, আমি মানবতার, আমি মানবধর্মের শিখণ্ডি, আমার ক্ষুধা পায়, আমি ঘুমাই, আমি বাথরুমে যাই, আমি সব ক্ষেত্রে একজন মানব হওয়ার বিবরণে বিভাসিত।

এখন প্রশ্ন শুধু মনটিকে নিয়ে? যদি আমি কুরআনে বিশ্বাসী হই, যদি সেই মতে জীবন যাপন করি অক্ষরে অক্ষরে, তা হলে আমি কি মানবিকতার ধর্ম থেকে বিচ্যুৎ হলাম? যদি সত্যিকার অর্থে খ্রিষ্টত্বের সবকিছু মেনে নিয়ে সব মানুষকে বুকে জড়িয়ে ধরি, তা হলে কি আমি মানবতার ধর্ম বহির্ভূত হলাম?

যদি বিবেকান্দ, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের বাণীর পূর্ণ সমর্থক হয়ে মানবতা ধর্মকে হৃদয়ে ধারণ করি, তা হলেও কি আমি মানবতার বাইরে? তা হলে আমার ধর্ম ও মানবিকতাবোধ কি সাংঘর্ষিক? আমি হিন্দু হলে কি মানব হতে পারব না? আর সত্যিকার মুসলমান হলে আমি কি কোনদিনই আধুনিক সংজ্ঞায় পথ চলতি মানুষের কাছে সাম্প্রদায়িকই কি রয়ে যাব?

অন্যের ব্যাপারে বিচলিত নই। যাকে ভালবাসি, সেই যদি আমার পথ আটকে ধরে, আর বলে আপনি বেশভুষায় দাড়িতে মুসলমানই নন, সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িক, তা হলে আমার কিছু বক্তব্য থেকে যায়। যদি মানতে না পারেন, নীরবে বিদায় দিন আমাকে। আমি একমাত্র আল্লাহতে সমর্পিত, অন্য কারও কাছে সমর্পিত হওয়ার বিন্দুমাত্র আগ্রহ বা ইচ্ছা আমার নেই। দিনে দিনে পরিণত আমি, আল্লাহকে চিনতে পারছি, আল্লাহ্ই আমার নিয়ামক, তিনিই আমার অধীশ্বর, আর কেউ নয়। আপনি তো ননই।

সামনে বিগ্রহ নেই, পুতুল নেই, উন্মুক্ত আকাশ, নীল সমুদ্র, যেখানেই পাতি জায়নামাজ, সেটাই মসজিদ, পুবে পশ্চিমে উত্তরে দক্ষিণে সবখানেই, তাঁর মুর্তিহীন মূর্তি। আমার কাছে মূর্তির প্রয়োজনীয়তা নেই। ধ্যানের গভীরেই তার অধিষ্ঠান, সহজেই খুঁজে পাই যখন আমার অশ্রু প্রবাহিত। আমার দেহের প্রতি শিরা উপশিরায় আল্লাহর ফেরেশতা, এটাই আমার বিশ্বাস [সা’ল তুশ্তারি]। ফেরেশতারা ঘিরে আছেন আমাকে, রক্ষা করার জন্যে সমস্ত অপবিত্রতা থেকে।

আল্লাহর নাম জিকির করার সঙ্গে সঙ্গে পবিত্রতার আবর্তে আমি, সেখানে শুধু প্রভু আর আমি। শয়তানের সাধ্য নেই সেখানে প্রবেশ করে। প্রতি অজু আমাকে নিয়ে আসে পবিত্রের কাছে, প্রতি সিজদা আমাকে নিয়ে আসে প্রভুর সবচেয়ে সন্নিকটে। প্রভু আমাকে দেখছেন সব সময়, লক্ষ্য রাখছেন আমার প্রতি। এই আমার বিশ্বাস। আমার বিশ্বাসের সঙ্গে মানবিকতার সংঘর্ষ কোথায়?

সংঘর্ষ তখনই, যখন আরেকজনের বিশ্বাসের প্রতি আমার ভ্রুকুটি। তার মূর্তি, তার বিগ্রহ, আমি ভেঙে ফেলে করি চুরমার। সেখানে আমি অমানবিক, সেখানে আমি ঘোরতর সাম্প্রদায়িক। দুই হাজার বছরের পুরনো বুদ্ধ মূর্তি যখন বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করি আফগানিস্তানে, যখন আমি অন্য ধর্মের মানুষকে বিনা কারণে গুলি করে হত্যা করি [কাশ্মির ও হায়দ্রাবাদে], যখন ‘আল্লাহু আকবর’ বলে লাখ লাখ খ্রিষ্টান ইহুদি ও হিন্দুদের বর্বরের মত আহত করি নিহত করি তখন আমি সাম্প্রদায়িক, তখন আমি অমানবিক, তখন আমি সমগ্র মানবগোষ্ঠীর শত্রু।

যখন হিন্দু মন্দির ভেঙে দি’, যখন লাখ লাখ মুসলমানকে হত্যা করি, পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক, তখন আমি অমানবিক। যখন আমি রাষ্ট্রের পর রাষ্ট্র বোমা মেরে উড়িয়ে দি’ [ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া], লাখ লাখ শিশু মাতা জায়া যখন হয় তাদের ড্রোন আঘাতের শিকার, তখন মুহূর্তেই বুঝতে সক্ষম হই ওরা মানব নয়, দানব। সর্বাপেক্ষা সাম্প্রদায়িক ওরা, দানবীয় ধর্মে দীক্ষিত।

যোগ সাধনাই যথেষ্ট নয়, কার সঙ্গে যোগ তা নির্ণয় করুন। পরমেশ্বরের সঙ্গে না দানবের সঙ্গে। সাম্প্রদায়িকতার আসল রূপ এখানেই। কাউকে পরাস্ত করব এটাই সাম্প্রদায়িকতার মূল লক্ষ্য। সবাই বুঝতে পেরেছেন। আপনিও পারবেন একদিন না একদিন।

আমার পিতা আব্বাসউদ্দিন যখন কলকাতায় একজন গীত শিল্পী, ধুতি পরে গান গাইতে আসতেন। প্রথমে দু’তিনটি ভজন গান গাইতেন। আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার গানের খাতায় এত ভজন, ব্যাপারটি কি? উনি বলতেন, ওখানে যারা গান শুনতে আসতেন, শতকরা নিরানব্বই ভাগ হিন্দু, তারাই গান বাজনার শ্রোতা, মুসলমানরা নয়। ওরা অনেক পিছনে।

হিন্দুরা পছন্দ করেন ভজন দিয়ে শুরু, ভজন দিয়ে শেষ। তাই বেশ ক’টা ভজন ভাল করে আয়ত্ব করেছি। ভজন অর্থাৎ ভগবানের উপাসনা। এর চেয়ে ভাল গান হয় না। ঠিক যেমন আমি গাই নাত এবং হামদ মুসলমানদের জন্যে। এর চেয়ে ভাল গান হয় না। এটাই অসাম্প্রদায়িকতা। এটাই ধর্মের মূলে প্রবেশ। নজরুল ১১০০ গান লিখেছেন শুধু হিন্দু দেব-দেবীদের নিয়ে। স্বার্থক গান।

কিন্তু এসব গান হিন্দুদের জন্যে, মুসলমানদের জন্যে নয়। কারণ মুসলমানদের জন্যে মূর্তি পূজা সম্পূর্ণ বারণ। দু’টি পথ দু’দিকে চলে গেছে। সাকা ও নিরাকার। নজরুলের প্রতিভা এত ব্যাপক ছিল যে দু’ধর্মই তাকে আকর্ষণ করেছে। সবার পক্ষে তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। অন্য একজনও বড় কবির নাম বলুন, যিনি মুহম্মদ [সা.] এর ওপর একটিও গান লিখেছেন?

দেখাতে পারবেন না। ওরা যে সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক। ওরা সম্প্রদায়ের অনেক উর্দ্ধে, তাই মুহম্মদ [সা.]-এর মতন লোক ওদের চোখের সামনে পড়েনি। তা হলে সম্প্রদায়ের ব্যাপারটা নিষ্পত্তি কিভাবে হবে? বড় গোলমেলে ব্যাপার। তাই আমাকে সাম্প্রদায়িক বলা থেকে বিরত থাকলে খুশি হব। আশা করি বোঝাতে পেরেছি। আমরা সবাই এক। শুধু পথ আলাদা।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: সাহিত্য-সংগীত ব্যক্তিত্ব,লেখক।
mabbasi@dhaka.net

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ