,



হাতুরে ডাক্তারদের আইনের আওতায় আনতে হবে

ডাক্তারদের আমাদের সমাজে অনেকেই খোদার পরের আসনেই বসিয়েছেন। সৃষ্টিকর্তার হুকুম থাকলে কেবলমাত্র ডাক্তাররাই সুচিকিৎসার মাধ্যমেই মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে এটিই আমাদের সবার বিশ্বাস। তাহলে ডাক্তার যেনতেন কোনো বিষয় না। এক মহান পেশার নাম ডাক্তারি বা চিকিৎসা পেশা। একটি পরিবারের সাধনা থাকে তাদের সন্তান ডাক্তার হবে। টাকা, শ্রম ও মেধার সব টুকু দিয়েই একজন মানুষ প্রকৃতপক্ষে ডাক্তার হতে পারে। পরিবারের সবচেয়ে মেধা সম্পন্ন সন্তানটিকেই অভিভাবকরা ডাক্তারি পড়ানোর জন্য নির্ধারণ করে থাকে। তারপর কণ্টকযুক্ত বিশাল এক রাস্তা বা অধ্যাবসায় শেষে কেবল একজন শিক্ষার্থী ডাক্তার হতে পারে। কিন্তু বড়ই আফসুসের বিষয় হলো বর্তমান সময়ে এই ডাক্তার নামধারী মানুষের অভাব নেই। কিসের লেখা পড়া কিসের মেডিকেল কলেজে যাওয়া,কোনো মতে ৩ থেকে ৪ মাসের কোর্স করেই একজন ডাক্তার হয়ে যাচ্ছেন অনায়াসেই। ঘর থেকে বের হলেই ডাক্তারদের চেম্বারের অভাব পড়ে না। যে দিকে তাকানো যায় মহাসড়কের আশেপাশে, বিশেষ করে মফস্বল এলাকার বাজারঘাটে অসংখ্য ফার্মেসি। হাতুরে ডাক্তার সেজে সবাই ডাক্তার বেশে বসে আছেন। ঔষুধ বিক্রি করার নূন্যতম প্রশিক্ষণ পর্যন্ত অধিকাংশ ফার্মেসিওয়ালাদের নেই। ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়াই ফার্মেসি গুলো চালানো হচ্ছে। আইনের কোনো তোয়াক্কা না করেই যেমন খুশি তেমন দামে বিভিন্ন ঔষুধ বিক্রি করছে। এমনকি সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ বিভিন্ন বেজাল ঔষুধ দেদারছে বিক্রি করছে। যৌন উত্তেজনামূলক ক্ষতিকারক ঔষুধও বিক্রি হচ্ছে এসমস্ত ফার্মেসিগুলোতে। পত্রপত্রিকায় প্রায় সময়ই দেখা যায় ভুল কিংবা অপচিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনা দিনদিন বেড়েই চলছে। আর এ সমস্ত মৃত্যুর ঘটনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গ্রামের বা মফস্বলের হাতুরে ডাক্তারদের কারণেই হচ্ছে। সর্দিজ¦র থেকে শুরু করে সব ধরণের চিকিৎসায় দিয়ে থাকে এরা এমনকি কাটাছেড়া পর্যন্ত করতে পিছপা হনা না এ সমস্ত হাতুরে ডাক্তাররা।

সম্প্রতি এ সমস্ত হাতুরে ডাক্তারদের সাথে যোগ হয়েছে আরো এক শ্রেণীর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক যাদের একাডেমিক কোনো ডিগ্রি বা সনদ কোনোটাই নেই শুধু মাত্র বাজার থেকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শাস্ত্রের উপর কিছু বই পড়ে চিকিৎসার নামে মানুষের ক্ষতি করে যাচ্ছে। সমাজের কিছু অসহায় মানুষের দারিদ্রতাকে পুঁজি করে রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের এ বাণিজ্য। আমাদের গাজীপুরের লোকাল কিছু ভিডিও চ্যানেল রয়েছে যাতে কিছু বিজ্ঞাপন দেখে রীতিমত কপালে চোখ উঠার মতো অবস্থা। স্যাটালাইট চ্যানেল পরিবর্তনের সময় মাঝে মধ্যেই চোখে আটকা পড়ে এ সমস্ত বিজ্ঞাপনগুলো। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো কবিরাজ বাড়ির বিজ্ঞাপন। এখানে সব ধরণের চিকিৎসা করা হয়। নারী পুরুষদের সমন্বয়ে এমন কিছু বক্তব্য এখানে দেওয়া হয় যাতে তারা বুঝাতে চায় যে কোনো ধরণের রোগবালাই তাদের কাছে গেলেই নিরাময় হয়ে যাবে। সব চেয়ে হাস্যকর বিষয় হলো তারা কিস্তিতেও চিকিৎসা করে থাকে, তাদের একটা ডায়লগ এমন যে ‘আস্তে আস্তে চিকিৎসা করুন আর কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করুন। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রশাসন পর্যন্ত সবাই জানে তাদের এ ধাপ্পাবাজির কথা কিন্তু নেই আইনের কোনো বাধানিষেধ। দিনের পর দিন মাসের পর মাস গ্রামের কিছু অসহায় স্বল্পশিক্ষিত মানুষকে প্রতারিত করেই যাচ্ছে তারা নতুন নতুন ফন্দি ফিকিরের মাধ্যমে।

অক্টোবর মাসের শেষভাগে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব পত্রিকাগুলোতে আমাদের উপজেলার এক হাতুরে ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় ৪ মাসের শিশু মৃত্যুর সংবাদ উঠে এসেছিলো। ঘটনাটি আমার গ্রামেরই ছিলো। শিশুটির পিঠে টিউমারের মতো দেখতে একটি সমস্যা হওয়ায় স্থানীয় একটি ফার্মেসিতে হাতুরে ডাক্তারের কাছে নিলে সে বলে এটা তেমন কিছু নয় সামান্য কেটে ঔষুধ লাগিয়ে দিলেই অল্প কয়েকদিনের মধেই ভালো হয়ে যাবে। ৪ হাজার টাকায় চুক্তি করে ৪ মাসের অবুঝ শিশুকে ব্লেড দিয়ে সমস্যাজনিত স্থানে কাটে। কাটার পর পরই প্রচ- রক্তপাত শুরু হয় এবং শিশুটি কাতরাতে থাকে এক পর্যায়ে তাকে হাসপাতালে পাঠালেও আর বাঁচাতে পারেনি। আজও ওই শিশু পুত্র হারানোর ব্যাথা ভুলতে পারেননি হত দরিদ্র বাবা মা। এ ধরণের ঘটনা হরহামেশাই ঘটে চলেছে আমাদের চারিপাশে। হাতুরে কিংবা ভুয়া ডাক্তারদের অপচিকিৎসায় কত মানুষকে যে প্রতিনিয়তই জীবন হারাতে হচ্ছে তার হিসেব জানা নেই। কাজেই এ সমস্ত হাতুরে বা ভুয়া ডাক্তারদের বিরুদ্ধে আইনের তদারকি আরো বাড়িয়ে দিতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ ব্যাপারে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। ফার্মেসি গুলোকে লাইসেন্সে বাধ্য এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের দিয়ে ফার্মেসি চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায়,সাধারণ মানুষ জীবন বাঁচাতে এসে জীবন হারাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখক : সোলায়মান মোহাম্মদ

sulaymansir87@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ