,



শিশু শ্রম ও নির্যাতন নিয়ে কিছু কথা

আমরা যেন দিন দিন বিশেষ দিনের অপেক্ষায় থাকা জাতিতে পরিণত হয়ে যাচ্ছি। নানা সমস্যায় জর্জরিত আমাদের সমাজটাও আজ ফেকাশে হয়ে যাচ্ছে যেন। যেমন বছরে একটি দিন উদযাপিত হয় নারীদের জন্য, একদিন শিশুদের জন্য, একদিন মাদককে না বলার জন্য কিংবা এমন আরো অনেক কিছুই। এই একদিনের জন্য আমাদের খরচও যথেষ্ঠ বেশি করতে হয় নানা আয়োজনের জন্য। কার্যত এই আয়োজন কতখানি ফলপ্রসূ তা আমরা হিসাব করে না দেখে, ভাবি আমরা শতভাগ সফল হয়েছি। মিডিয়ায় ফলাও করে সংবাদ প্রকাশ করা হয়।

অবশ্যই বিশেষ দিনকে বিশেষভাবে পালন করতে হবে এতে আমি একমত। কথাটি হলো সেই অনুষ্ঠানটি যখন রাজধানীর কোন আভিজাত অডিটরিয়াম কিংবা সাত তারা হোটেলে হয় তার তাৎপর্য কতটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে তার একটা হিসেবতো করতেই হবে নয়তো এতো বড় আয়োজনে দিবসটি উদযাপনে কি অর্জিত হলো তা অজানাই থেকে যাবে। কয়েকজন মন্ত্রী আর সচীবদের উপস্থিতিতে সাধারণত প্রতিটি দিবস জমকালো ভাবে পালন করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীও উপস্থিত থাকেন। যত বড় নেতা কিংবা আমলা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন সেই অনুষ্ঠানে ততো বেশি খরচ হবে এটাই স্বাভাবিক।

শিশু দিবসে যেমন বলা হয় শিশু শ্রম বন্ধ করা হবে, শতভাগ শিশুকে স্কুলে নেয়া হবে। কোথাও যেন শিশু শ্রমিক নিয়োগ না হয় সেইদিকে সর্বদায় সজাগ থাকবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়। শিশু নির্যাতন বন্ধ করা হবে এমন নানা অঙ্গিকার করা হয়। শিশুদের জন্য জানানো হয় নানা প্রকল্পের কথা, একাধিক বক্তা তাদের অর্জনের কথা শোনায় যা সংবাদমাধ্যমে প্রচার হয় নিয়মিত। অথচ কোন ভাবেই শিশু শ্রম বন্ধতো দূরের কথা শিশু নির্যাতনই কমানোই যাচ্ছেনা বরং ক্রমবর্ধমান হারে তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। হোটেল, রেস্টোর‌্যান্ট, পরিবহন, বিভিন্ন দোকানপাট, বিভিন্ন কারখানায় রয়েছে চোখে পরার মতো শিশু শ্রমিক।

ঝুকিপূর্ণ কাজে শিশুদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। তাহলে কথা হলো শিশুদের নিয়ে যে মন্ত্রণালয় এতো কাজ করছে, এতো প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, অনেকেই কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ এওয়ার্ড পাচ্ছে এমনকি সরকারের বেশ মোটা অংকের টাকাও খরচ হচ্ছে, কিছুটা হলেও যে তা ম্লান হয়ে যাচ্ছে তা নিয়েও তো ভাবতে হবে! পোল্ট্রি শিল্পে রয়েছে অনেক শিশু শ্রমিক, লেগুনার মতো পরিবহনেও শিশু শ্রমিকের উপস্থিতি অনেক। একাধিত জাতিয় দৈনিকে নিয়মিতই অনেকেই লিখেছেন শিশুদের ঝুকিপূর্ণ কাজে সম্পৃক্ততার কথা। বিভিন্ন বাসাবাড়িতেও বাড়ছে শিশুদের গৃহকর্মী হওয়ার সংখ্যা। একটি পুরাতন মটরসাইকেল বিক্রয় কেন্দ্রে ৩ জন শ্রমিক সবাই শিশু, পাশেই একটি রেস্টুরেন্ট এ রয়েছে ৬ জন শিশু শ্রমিক, মার্কেটের ৯০% দোকানে গড়ে দুজন করে শিশু শ্রমিক, এভাবে হিসেব করলে দেখা যাবে শুধু  গাজীপুরের শ্রীপুরেই মোট শ্রমিকের চল্লিশ শতাংশ শিশু শ্রমিক কাজ করছে। তাহলে শিশুদের জন্য যে পরিমান লোকবল ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে তা কি অপ্রতুল? এমন কি যে অর্থ সঠিক স্থানে ব্যয় হচ্ছেনা? বিষয়গুলি নিয়ে একটু ভাবনার প্রয়োজন অনুভব করছি। অন্তত যে হারে শিশু শ্রমিক বাড়ছে তা উদ্বেগের।

কথা বলেছি শিশুশ্রমিকদের কয়েকজনের সাথে, সংসারের অভাবের কথা বলেছে বেশিরভাগ, আবার বাবা মা নেই তাই কাজ করে এমনও আছে কেউ কেউ। বাবা নেশাগ্রস্থ তাই স্কুলে যেতে দেয়না কাজে পাঠায় উপার্জনের জন্য, আবার কারো বাবা বিয়ে করে অন্যত্র থাকে এমন কারণও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আরেকটু গভীরে কাজ করতে হবে। শুধু যে শিশু শ্রম বিক্রি হচ্ছে তা নয়, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে অনেক শিশু। এ বিষয়গুলি দ্রুতই সমাধান না করতে পারলে মধ্যম আয়ের দেশ হলেও যে শিশু শ্রমিকের অনুপাত থাকবে তা দুঃখজনক। দারীদ্রতার কারণেই বেশিরভাগ শিশু শ্রমিক হচ্ছে যা আমাদের মধ্যম আয়ের দেশে উন্নিত হওয়ার উৎসবকে ফিকে করে দিতে পারে। বেশ কয়েকটি বিষয় শিশুদের শ্রমিক হতে উৎসাহ দেয় কিংবা বাধ্য করে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাদক, বিবাহ বিচ্ছেদ, বাল্যবিবাহ, শিক্ষা, স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাব। মাদকাগ্রস্থ বাবা সন্তানকে বাধ্য করে শিশু শ্রম দিতে। বাল্য বিবাহের ক্ষেত্রে দেখা যায় শিশু মা হয়ে যায়, অল্প বয়সে মা হতে গিয়ে শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় সাথে নানা রোগ এতে অনেক সময় কিশোরী মায়ের মৃত্যু তার সন্তানকে শিশু শ্রমিক বানিয়ে দেয়। বিবাহ বিচ্ছেদ ও স্থায়ী ভালো কাজের অভাবে স্বামী হারা নারী তার সন্তানকে শিশু অবস্থায় কাজে নিয়োজিত করে। সমাজের একটা বৃহৎ অংশ শিক্ষিত বেকার তরুণ তাই মানুষ তার ছেলে মেয়েকে এখন আর লেখাপড়া শিখাতে উৎসাহ পায়না। একজন শিক্ষার্থীকে লেখাপড়া শেষ করাতে পরিবারকে অনেক টাকা খরচ করতে হয় পক্ষান্তরে শিশু শ্রম দিলে টাকা খরচতো হয়ই না প্রতিমাসে ইনকাম হয়।

অল্প শিক্ষিত রাজনৈতিক দলের কর্মী হলে আয়-রোজগার বেশি হয় তাই নাবালক বয়সেই কাজে ও রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে সন্তানকে নিয়োজিত করে অনেক বাবা-মা। শিক্ষার সুফল না পেয়ে অনেক পরিবার এখন শিশু শ্রমের উপর নির্ভরশীল। মাদকের যেন কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও মাদক ব্যবসায় জড়িত হওয়ার খবর প্রকাশ হয়, যাদের মাদক নিয়ন্ত্রণ করার কথা তারাই যখন মাদক বিক্রেতা তখন মাদকাশক্ত বাবা তার সন্তানকে শিশু শ্রমের জন্য বাধ্য করবে এটাই স্বাভাবিক। দোকান পাটে সব থেকে সুন্দর করে সাজানো থাকে সিগারেটের অংশটি, প্রকাশ্যে এভাবে সিগারেট বিক্রি বন্ধ না করলে মাদক বিরোধী র‌্যালি কিংবা একটি বিশেষ দিনে মাদককে না বলুন সেমিনার করে তা রোধ করা যাবেনা। মাদককে রোধ করতে হলে প্রথমে প্রকাশ্যে দোকানে যেন নিকোটিন মানে বিড়ি সিগারেট বিক্রি করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। বাল্য বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের আইনকে আরো বেশি প্রয়োগ করতে হবে, যেন বিবাহ বিচ্ছেদ করতে কেউ সাহস না পায়। নির্দিষ্ট সংখ্যক সরকারী কর্মকর্তাদের বার বার বেতন না বাড়িয়ে অধিক সংখ্যক বেকারদের চাকরিতে প্রবেশের ব্যবস্থা করতে হবে, যেন মানুষ আস্থা ফিরে পায়। এতে দুটি সমস্যা অটোমেটিক সমাধান হবে, বেকার সমস্যা ও মাদকাশক্ত। বেকারত্ব, মাদক, বাল্য বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ রোধ হলে শিশু শ্রমের  ক্রমহৃাস হবে। শিশুদের নিয়ে সরকারের যে সকল কর্তাব্যক্তিগণ কাজ করেন তাদের দায়িত্ব পালনে আরো মনোযোগী হতে হবে। প্রতিটি শিশু শ্রমিকের সাথে কথা বলে সে কেন শ্রমিক হলো তার কারণ বের করে সেই কারণের সমাধান করতে হবে। যে পরিবারে বাবার অকাল মৃত্যু হয়েছে সে পরিবারকে আর্থিক নিরাপত্তা সহকারে সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য একটি পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। প্রতিটি এলাকার স্কুল প্রধান ও স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করা যেতে পারে, এই টিম প্রতিটি এলাকার শিশু শ্রমিকদের তালিকা তৈরি করে উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে জানাবে। এই প্রতিবেদনে কেন তারা শিশু শ্রমিক হলো তার ব্যাখ্যা থাকবে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কোন পন্থা অবলম্বন করে এই সকল শিশু শ্রমিকদের স্কুলে ফিরিয়ে নেয়া যায় তার ব্যবস্থা করবে শিক্ষা অফিসার। একটি বিশেষ দিনে শুধু শিশুদের নিয়ে কথা বলে অনেক খরচ আর সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করে নয়, সারা বছর ধরেই শিশুদের জন্য কাজ করবে যেন কোথাও কোন কারণে একজন শিশুকেও শ্রম বিক্রি না করতে হয় কিংবা নির্যাতনের শিকার হতে না হয়। শিশু শ্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট নিয়ামকগুলোকে উপড়ে ফেলতে হবে চীরতরে।

মানবতার জননী, আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী যে স্বপ্নের বীজ বুনেছেন তা যেন অঙ্কুরেই নষ্ট না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বশরীরে প্রতিটি শিশু শ্রমিকের সাথে কথা বলতে হবে, কারণ খোঁজে বের করতে হবে এবং সমাধান দিতে হবে। শুধু অফিস কক্ষে বসে শিশু শ্রমিক নেই বলে রিপোর্ট দিয়ে সমাধান হবেনা। বাঙালী জাতি একটি মেধাবী ও বীরের জাতি। সারা বিশ্বে দাপটের সাথে যেন শ্রমবাজার দখলে নিতে পারে সেভাবে শিশুদের শিক্ষা দিতে হবে। পেশাজীবি প্রতিটি বিভাগে বাংলাদেশের ছেলে মেয়েরা লিডিং অবস্থানে যেন থাকতে পারে সেভাবে প্রশিক্ষণ ও লেখাপড়ার মান শিশু শ্রেণী থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গ্লোবালাইজেশনের যুগে একটি দিবসে নয়, বছর জুড়েই হবে শিশুদের উন্নয়ন, থাকবেনা শিশু শ্রমিক, বন্ধ হবে শিশু নির্যাতন এই প্রত্যাশা প্রাপ্তিতে দেখার অপক্ষো করছে সাধারণ জনগণ।

লেখক: প্রকৌশলী মো. সাব্বির হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ