,



ভাষার মিশ্রণ অশোভনীয়

“জানোই তো, কালকে টুয়েন্টি ফার্স্ট ফেব্রুয়ারি, সেলিব্রেট না করলে হয়। আফটার অল, এই দিনের আলাদা একটা ইম্পরট্যান্স আছে না? আরেহ, ইন দ্যা ইয়ার নাইন্টিন সেভেন্টিওয়ান, এই দিনেই তো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ডার্কনাইটে আর্মস নিয়ে আমাদের মাম্মি ড্যাডিদের উপর এ্যাটাক করেছিলো। রফিক , জব্বারসহ অনেকেই তাদের লাইফ সেক্রিফাইজ করেছিলো……”
কথাগুলো খুব রসিয়ে এক মেধাবী বন্ধু সমাজের বাস্তবচিত্র ব্যঙ্গ করে তার ফেসবুকে লিখেছিলো। কথাগুলো যে শতভাগ সত্য তা কাউকে চিমটি কেটে বুঝাতে হবে না। মিটিং-মিছিলে, অফিস-আদালতে, স্কুল-কলেজে এমনকি বাংলা ভাষার তাৎপর্য নিয়ে টিভি টকশোতেও আলোচনার সময় এমন রঙ তামাশা চলছে অবিরাম। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতে গিয়ে বাংলার সাথে মিশিয়ে দু’চারটা ইংরেজী না ফাটালে নিজেদের আর এখন যোগ্যই মনে হয় না, এমন অবস্থায় আমরা দাঁড়িয়েছি। নিজেদেরকে বিখ্যাত করার জন্যই মূলত আমাদের অনেকেই ভাষার সাথে এমন পৈশাচিক আচরণ করে থাকেন।

একজন বিখ্যাত মানুষের কথা না বলে পারছি না। খুব সম্ভবত ২০০৬ সালে বিশ^খ্যাত ফুটবল তারকা জিনেদিন জিদান বাংলাদেশে এসেছিলেন। গাজীপুরের মজলিশপুরেও তিঁনি নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুসের সাথে একটি আয়োজনে উপস্থিত হয়েছিলেন। মজলিশপুর স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সাথে আনন্দ করে ফুটবলও খেলেছিলেন। আমি তখন গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজে ইংরেজী বিভাগে পড়ি। পাশেই একটি ছাত্রাবাসে থাকি। কয়েকজন বড় ভাইয়েরা বললো তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হও পাশের এলাকায় ফুটবলের জাদুকর জিনেদিন জিদান আসছে, আমরা যাচ্ছি সবাই। রুম থেকে দৌড়ে বের হলাম তাকে দেখতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। মজলিশপুর যেয়ে দেখি হাজার মানুষের ঢল, কৃষকের পাকা ধান ক্ষেতের বারোটা বাজিয়ে মানুষজন উপচে পড়ছে এক নজর জিদানকে দেখতে। আমরাও তাই করলাম। জনশ্রুত মারিয়ে, পুলিশের বাধা ডিঙ্গিয়ে জিদানের মুখোমুখী হতে পেরেছিলাম। কথা বলার সৌভাগ্যও হয়েছিলো। প্রায় ছয় থেকে সাত মিনিট জিনেদিন জিদানের সাথে কথা বলেছিলাম। অবাককর বিষয় হলো আমি ইংরেজীতে প্রশ্ন করলেও তিঁনি একটি প্রশ্নের জবাবও ইংরেজীতে দেননি। তিঁনি ফরাসি ভাষায় কথা বলেছিলেন কিন্তু তাঁর লোক ইংরেজীতে অনুবাদ করে দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে ইংরেজী না বলার কারণ জিজ্ঞেস করাতে তার ব্যক্তিগত সহযোগী উত্তর দিলো জিদান সচরাচর নিজের ভাষা রেখে অন্য ভাষা ব্যবহার করেন না। এমনকি খুব বেশি প্রয়োজন না হলে মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষা একেবারেই বলেন না।

সিনেমা জগতের রোল মডেল বলিউড বাদশা শাহরুখ খান সহ পৃথিবীর আরো অনেক বিখ্যাত মানুষই রয়েছে যারা টিভি উপস্থাপনা বা কোনো আলোচনায় এসে অহেতুক মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলেন না। কিন্তু খুব দু:খ হয় যখন দেখি আমাদের দেশের সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কোন একজন ব্যক্তি ইংরেজী ও বাংলার মিশ্রণ এমনভাবে করছেন যা শুনলেও বিরক্ত লাগে। খুব রাগ হয়েছিলো যেদিন দেখলাম তিনি বাজেট পেশ করছেন অথচ দু’ভাষার সংমিশ্রণে। কৃষক-শ্রমীক ও সাধারণ মানুষের জন্য পাশ করা ঐ বাজেট যদি ইংরেজীতে দেওয়া হয় তাহলে আমাদের দেশের কতজন সাধারণ মানুষ তা বুঝবে তা আমার বোধগম্য নয়।

তরুণরা কোথায় শিখবে কার কাছে শিখবে? তা সত্যিই আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। এমনিতেই আমরা নতুন প্রজন্ম ভুলে যাচ্ছি ১৩৫৮ সালের ৮ ফাল্গুন (২১ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশে রাষ্ট্রভাষা বাঙালার দাবীতে আন্দোলনরত ছাত্র ও প্রগতিশীল মানুষের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণে সালাম, রফিক, জব্বার ও বরকতসহ আরো নাম না জানা অনেকের বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত ঢাকার রাজপথের সেদিনের সেই ইতিহাস। অসংখ্য জীবন দিয়ে অর্জিত যে মায়ের ভাষা আমরা অর্জন করেছি তার মান আমাদেরই রাখতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না ইংরেজী যেমন আন্তর্জাতিক ভাষা তেমনই সারা বিশে^র সকল দেশের ভাষাকে রেখে কেবলমাত্র আমাদের মাতৃভাষাকেই ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করেছে। তারপর থেকেই বিশ্বের সব দেশ এই ভাষার সম্মানে এ দিনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। ভুলে গেলে চলবে না সম্প্রতি এই বাংলা ভাষায় দেওয়া বঙ্গ বন্ধুর ৭ মার্চের সেই কালজয়ী ভাষণকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামান্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। সুতরাং ভাষা নিয়ে যদি গর্ব করতে হয় তাহলে বাংলা ভাষা নিয়ে বিশ্বের শুধুমাত্রও আমরাই গর্ব করতে পারি।

তবে ইংরেজী বলা যাবে না বা বলা নিষেধ এমন কিন্তু কখনও বলা হয়নি। কেউ ইংরেজী বা অন্য কোনো ভাষায় পারদর্শী সেটা আরো গর্বের বিষয়। কিন্তু মিশ্রণ করে কেনো? যখন যে ভাষা ব্যবহার করা হবে তার সম্পূর্ণ বাক্যই কিংবা পুরো অনুষ্ঠানই যে কোনো একটি নির্ধারিত ভাষায় পরিচালনা করলেই হলো। অথবা অন্ততপক্ষে একটি সম্পূর্ণ বাক্য একটি ভাষায় হতে পারে।
ইংরেজী বলার নির্দিষ্ট জায়গা আছে। যেমন, ইংরেজী শেখার আসরে বাংলা বলবে কেনো? শ্রেণীকক্ষে ইংরেজী পাঠদানের সময়ে শিক্ষক বাংলা বলবে কেনো? তাছাড়া যারা ইংরেজী জানে না তাদের সাথে বাংলা বলে লাভ কি। নিজের দেশকে বাহিরের দেশে উত্তীর্ণ করতে ইংরেজী বলবে সেখানে বাংলা বললে কে বুঝবে। ইংরেজী শিখতে ও শিখাতে উভয় ক্ষেত্রে একটি বাংলা শব্দও ব্যবহার না করাই শ্রেয়।

ইংরেজি আমাদের দেশে দ্বিতীয় ভাষা এবং বিশ্বের সর্বাদিক পরিচিত ও ব্যবহৃত ভাষা সেই দিক থেকে এর গুরুত্বও অপরিসীম। তাই এ ভাষাও আমাদের আয়ত্ত করা জরুরী।

সব শেষে বলতে চাই ভাষা নিয়ে আমাদের বর্তমান সমাজে যা শুরু হয়েছে তাতে সব ভাষাকেই অসম্মান করা হচ্ছে। বাংলার সাথে ইংরেজীর মিশ্রণে ইংরেজী ভাষাকেও খাটো করা হচ্ছে। আর আমাদের মাতৃভাষাকেও ধ্বংসের ধারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সরকারও ইচ্ছা করলে এ বিষয়ে রেডিও ও টিভি অনুষ্ঠানমালার ভাষাগত নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
আসুন শুদ্ধ ও খাটি বাংলার চর্চা করি, যতটা সম্ভব যেখানে সম্ভব বাংলা বর্ণমালাকে স্থান দিয়ে শহীদদের সম্মান জানানোর মধ্য দিয়ে নিজেরা সম্মানিত হই।

 

লেখক: সোলায়মান মোহাম্মদ
সম্পাদক,আজকের বাংলা খবর ডট কম
ajkerbanglakhabor@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ