,



এফ এইচ প্রিয়কের মতো বাবারা এমনই হয়

পিতামাতার কাছে সন্তান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। যার সন্তান নেই কেবল সেই বুঝেন সন্তানের কদর। কোটি টাকার গাড়ি, আলিসান বাড়ি, সামাজিক মর্যাদা কিছুতেই ততটুকু সুখ দিতে পারে না যতটুকু সুখ পিতামাতাকে সন্তানের একটিমাত্র হাসিতেই এনে দিতে পারে। বাবারা সারা জীবন শুধু দিয়েই যান সন্তানদের পক্ষান্তরে এই সন্তানরাই বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মাকে সীমাহীন কষ্ট দিয়ে থাকে। ইসলাম ধর্মে খুব কঠিনভাবে বলা আছে পিতামাতার সাথে কেমন আচরণ করতে পারবে তার সন্তানেরা। মা যখন বৃদ্ধ বয়সে উপনিত হবেন তখন সন্তানের ব্যবহারে কষ্ট পেয়ে ওহ্ শব্দটিও যাতে না করেন তেমনই দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে ইসলামে।

একজন বাবা নিজে খেয়ে না খেয়ে নিজের রক্ত পানি করে দিনরাত খেটে নিজের সন্তানকে মানুষ করেন। বাবা জীবিকা নির্বাহের তাগিদে ব্যবসা বা চাকরীর জন্য যেখানেই থাকেন সারাক্ষণ চিন্তাই থাকেন তার সন্তান কি করছে না করছে। পৃথিবীর সব বাবাই চায় তার সন্তান অনেক বড় হোক ভালো কিছু করুক বিনিময়ে সন্তানের কাছে কিছুই চাওয়ার থাকে না একজন বাবার। বাবারা সন্তানের জন্য সব পারেন, প্রয়োজনে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে হলেও সন্তানকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন।

সন্তানের সুখের জন্য বাবারা নিজের জীবনকে হাসি মুখে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন আজকে তেমনই একজান বাবার গল্প বলবো। সম্প্রতি নেপালের ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় সারা পৃথিবীতে শোকের ছায়া নেমে আসে। চোখের পলকেই ঝড়ে যায় ৫১টি তাজা প্রাণ। বিমান বিধ্বস্তে নিহতদের ২৮জনই বাংলাদেশের নাগরীক। এ জন্য বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রিয়ভাবে একদিনের শোক পালন করেছে। যারা নিহত হয়েছেন তাদের স্বজনদের পৃথিবীর সব কিছু দিয়ে দিলেও স্বজন হারানোর এ শোক তারা ভুলতে পারবে না। কেঁদেছি আমরা কেঁদেছে সমগ্র বাংলাদেশ তাদের এ মর্মান্তিক বিয়োগে। নেপালের ত্রিভূবন ট্রাজেডিতে ৫১ জনের মৃত্যুই আমাদের কাঁদিয়েছে তবে দু’টি মৃত্যু আমাদের হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করেছে, হয়েছি বাকরুদ্ধ। এক বাবা সন্তানের জন্য বাবাদের যে ভালোবাসা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পৃথিবীর সকল সন্তানদের জানিয়ে দিয়েছেন বাবারা কখনও সন্তানকে মৃত্যুমুখে রেখে পিছু হটেন না।

বলছিলাম বিমান বিধ্বস্তে নিহত গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের ফারুক হোসেন প্রিয়কের কথা। স্ত্রী, একমাত্র কন্যা সন্তান তামাররা প্রিয়ন্ময়ী,ফুফাতো ভাই ও ভাইয়ের স্ত্রীকে নিয়ে ফারুক হোসেন প্রিয়ক আনন্দ ভ্রমণে নেপাল যাত্রা করেছিলেন। তামাররা’র বয়স মাত্র ৩ বছর। বাবা মেয়ের দুষ্টামী আর খুনশুটিতে সারাক্ষণ বাড়িতে হৈচৈ লেগেই থাকতো। বাবাদের কাছে মেয়ে সন্তানেরা একটু বেশিই আদুরে থাকে তারউপর আবার প্রথম সন্তান। আরব্য রজনী আলিফ লায়লার চরিত্র মালিকা হামিরার প্রাণভ্রমরা যেমন একটি পাখির মধ্যে লোকায়িত ছিলো তেমনই ফারুক হোসেন প্রিয়কের প্রাণপাখি লোকায়িত ছিলো একমাত্র শিশু কন্যা তামাররা’র মধ্যে। আনন্দ আর হাসি খুশিতেই তাদের সংসার চলছিলো।

কিন্তু হঠাৎ করে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো এক নিমেষেই সব তছনছ হয়ে গেলো। ফুফাতো ভাইয়ের অনুরোধে ফারুক স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নেপালের উদ্দেশ্যে ইউএস বাংলার বিমানে আকাশে উড়ে। আকাশে উড়ার আগে ছোট্ট সোনামনি তামাররা তার দাদুকে ফোন করে বলে,‘‘দাদু,আমরা আকাশে উড়বো, কি মজা কি মজা”। তারা যে উড়াল দিয়ে একেবারেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে তা কে জানতো। ফারুক মেয়ে তামাররা ও স্ত্রী এ্যানিকে নিয়ে বিমানের মাঝামাঝির ঠিক একটু সামনে বসে। পিছনে ফুফাতো ভাই মেহেদী হাসান ও তার স্ত্রী স্বর্ণা বসে। বিমানটি ল্যান্ডিংয়ের মূহুর্তেই ঘটে হৃদয় বিদারক মর্মান্তিক সেই ঘটনা। বিমান ক্রাশের ঘটনা। দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে আসা মেহেদী হাসানের বর্ণনানুযায়ী ফারুক বাঁচতো যদি সে তার মেয়েকে বাঁচাতে না যেতো। স্ত্রী, ফুফাতো ভাই ও ফুফাতো ভাইয়ের স্ত্রী বাহিরে আসতে পারলেও ফারুক আসতে পারেনি। ফারুক আসতে পারেনি কথাটা মোটেও ঠিক না। বিমানে আগুনের ধোঁয়ায় চারিদিকে অন্ধকারে যখন কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না ঠিক তখন ফারুক পাগলের মতো খোঁজে বেরাচ্ছিলো কলিজার টুকরা সোনামানি তামাররাকে। সবাই যখন চাচা আপন জান বাঁচা এই মন্ত্রে ছুটাছুটি করছে ঠিক তখন ফারুক হয়তো তার প্রাণপাখি তামাররাকে দাউ দাউ করে জ¦লে উঠা ভয়াবহ রাক্ষুসে আগুনের মধ্যে এদিকসেদিক খোঁজে ফিরছিলো। আর বার বার হয়তো বলে বেড়াচ্ছিলো আম্মু, সোনামনি, কলিজার টুকরা সাত রাজার ধন মামুনি তুমি কোথায়? খোঁজেও হয়তোবা পেয়েছিলো কিন্তু ততক্ষণে আগুণের নির্মম ছোয়ায় প্রাণভ্রমরা পাখিটি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলো।

আমি হলফ করে বলতে পারি আগুনের এ ভয়াবহ তাপ এক চুল পরিমানও কষ্ট দেয়নি বাবা ফারুককে যতটা কষ্ট দিয়েছে সন্তানের অগ্নিদগ্ধতায়। তাই প্রাণের চেয়েও প্রিয় সন্তানের ভালোবাসার টানে সন্তানের সাথেই বিদায় নেয় বাবা নামের ফারুক হোসেন প্রিয়ক। পৃথিবীর মানুষের শেষ শ্রদ্ধা ও দোয়াও একসাথেই গ্রহণ করে এ বাবা-মেয়ে। প্রথমে বাবার জানাযা পরে এক সারিতে দাঁড়িয়েই মেয়ের জানাজা পড়া হয়। জানাযা নামাজ শেষে বাবা-মেয়েকে পাশাপশি কবরে চিরনিদ্রায় ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়। তামাররা জীবত থাকতে যেমনটি বাবার বুকে ঘুমাতো ঠিক তেমনভাবেই বাবার বুকে চিরসুখে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে গেছে।

বাবা ফারুক নিজের জীবন দিয়ে আবারো প্রমাণ করে গেলেন বাবারা সন্তানদের কখনও বিপদে বা দূরে কোথাও একা ছাড়েন না। এফ এইচ প্রিয়কের মতো বাবারা এমনই হয়। বর্তমান সমাজের বিগড়ে যাওয়া সন্তানদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেলেন এবং বুঝিয়ে গেলেন বাবার মমতা ঠিক কতটুকু হয়। প্রমাণ করলেন বাবাদের সন্তানের প্রতি ভালোবাসার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ