,



ড. রুবানা হক: এক নিঃসঙ্গ অভিভাবক

‘যদি মনে হয় জীবনে অনেক কষ্ট, অনেক সংগ্রাম—তাহলে এগোনো যায় না। এগিয়ে যেতে হলে সমস্যা মোকাবিলা করেই এগোতে হয়। জীবনের ট্র্যাজেডিকে ট্র্যাজেডি মনে করা যাবে না’।-জীবনকে যিনি এভাবে দেখেন তিনি ড. রুবানা হক। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী।

১৯৬৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি জন্মেছিলেন এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। এসএসসি, এইচএসসিতে বোর্ডে স্ট্যান্ড করা মেধাবী ছাত্রীটি ১৫ বছর বয়স থেকে টিউশনি করতে শুরু করেন। সেই টাকায় নিজের পড়ালেখার খরচ চালাতেন তিনি।

আনিসুল হকের সাথে বিয়ের পরে তিনি একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। কাজটা তিনি ভালোবাসা নিয়েই করছিলন। আনিসুল হকের ব্যবসাও চলছিল ভালো। কিন্তু অতিরিক্ত কাজের চাপে আনিসুল হকের উচ্চ রক্তচাপ কমছিল না। তিনি স্ত্রীর সাহায্য চাইলেন ব্যবসার কাজে।

সেই থেকে রুবানা শিক্ষকতা ছেড়ে স্বামীকে সাহায্য করতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন বিচক্ষণ ব্যবসায়ী। আর এতোদিন পরে আজ ২১ টি প্রতিষ্ঠানের তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

তাঁর সব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছে তিনি মায়ের মতো। কার কী প্রয়োজন, কার কোথায় সমস্যা—সেগুলো তিনি গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখেন। সময়মতো সবাই যেন বেতন পান, সে ব্যাপারে তাঁর থাকে সর্বোচ্চ চেষ্টা। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছে। ব্যবসায়িক বিষয়ে তিনি দ্রুত এবং বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে সিদ্ধহস্ত। আনিসুল হক স্ত্রীর এই ক্ষমতায় অবাক হয়ে বলতেন, এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নাও কী করে?

এক বছর আগে নির্ভরতার ছায়া আনিসুল হক চলে গেলে ভেঙে না পড়ে নিজেকে আরও শক্ত করেছেন। নিজেকে নিজে বুঝিয়েছেন, সব ঠিকঠাক চালিয়ে নিতে হবে। এতোগুলো প্রতিষ্ঠান, এতগুলো মানুষের দায়িত্ব তাঁর উপরে। ভেঙে পড়লে চলবে না। সব কিছু শক্তভাবে সামলাতে হবে। পারতে হবে। তিনি পেরেছেন।

‘শি ফর শি’ নামে একটি উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। কোনো মেয়েকে যদি হতাশায় ভুগতে দেখেন, তাঁকে ঝাঁকি দেন, তাঁর কথা শোনেন রুবানা। পাশে থাকার চেষ্টা করেন। ‘শি ফর শি’ নিয়ে অনেক কিছু করতে চান রুবানা হক।

সামাজিক কাজ, কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনকে কখনও আলাদা করে দেখেননি তিনি। সব মিলিয়েই তো জীবন। ঘরের মানুষ, বাইরের মানুষ, যারাই তাঁর সাথে কোন না কোন ভাবে যুক্ত, সকলেই যেন তাঁর পরিবারের অংশ।

পরিবারের সদস্যদের প্রতি দায়ভার বা ভালোবাসা থেকেই পোশাক কারখানার মেয়েদের পড়াশোনার ভার নিয়েছেন তিনি। তাঁদের পড়াচ্ছেন চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে (এইউডব্লিউ)। এইউডব্লিউর বোর্ডেও রুবানা হক ট্রাস্টি। তাঁদের জন্য এককালীন অনুদান দিয়েছেন। এখানকার মেয়েরা যখন ই-মেইল করেন, তাঁদের কোনো সফলতার কথা কিংবা প্রয়োজনের কথা বলেন, রুবানার তখন খুশিতে মন ভরে যায়। এসবের পাশাপাশি তিনি আনিসুল হক ফাউন্ডেশন, শারাফ মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কাজও চালিয়ে যাচ্ছেন।

পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী এই নারী অবসরে কবিতা লেখেন। লেখেন প্রবন্ধও। কবিতা লিখে পেয়েছেন সার্ক সাহিত্য পুরস্কার। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বিবিসির করা বিশ্বের ১০০ অনুপ্রেরণাদায়ী ও প্রভাবশালী নারীর তালিকায় স্থান পেয়েছে তাঁর নাম।

এতগুলো প্রতিষ্ঠান চালানোর পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব পালন। শি ফর শি’র হয়ে কাজ। আছে কবিতায় ডুবে থাকা প্রহর। সংসার-সন্তান। অষ্টপ্রহর ব্যস্ততা। কখনও কি তিনি আকাশের দিকে তাকান? মন কেমন করা এই শহরে, ব্যস্ততার প্রহরে মিস করেন প্রয়াত স্বামীকে?

এই প্রশ্নের জবাবে তিনি চোখ মেলে তাকান। খুব ধীরে, নিচু স্বরে জানান- স্বামী আনিসুল হককে যতটা মিস করেন তার থেকে বেশি মিস করেন এখন বন্ধু আনিসুল হককে। একা এই জীবনে মনে হয় আনিসুল হক নেই কিন্তু আছেন আবার। এই বুঝি ‘রুবু’ বলে তিনি ডেকে উঠবেন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ