,



বিধ্বস্ত মানবতা

বিশ্ববাসী নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে বর্বরতম হামলায় নিহত মানুষের শোকের রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই শ্রীলঙ্কায় আবারো সন্ত্রাসী হামলা। প্রায় ৪ শ মানুষ সন্ত্রাসীদের বোমার আঘাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো। ৫ থেকে ৬শ মানুষ মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে। আর অন্যদিকে সন্ত্রাসীরা বুনো উল্লাসে মেতে উঠেছে। বুনো উল্লাস শেষে হয়তো তারা আবারো পৃথিবীর অন্য কোথাও শান্তিপ্রিয় মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আমাদের দেশেও নাকি এমন সন্ত্রাসী বোমা হামলার চেষ্টা চলছে যা প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট দক্ষ ও সচেতন বলে সুযোগ পাচ্ছে না। সন্ত্রাসী হামলা না হলেও আমাদের দেশে মানবতা বলতে আজ আর কিছু নেই। স্বার্থবাদীতা, অর্থালোভ ও ক্ষমতার মোহে মানবতা আজ নিরুদ্দেশ। কোথায় হারালো মানবতা বলতে পারেন? কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনু, সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনি আজও মানবতা খোঁজে বেড়াচ্ছে। সর্বোশেষ নুসরাত সেই মানবতার খোঁজে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলো। তনুর মা আনোয়ারা বেগম এখন আর প্রশাসনের কাছে বিচার চায় না, আকাশের পানে আল্লাহর কাছে মেয়ে হত্যার বিচার প্রার্থনা করে। নুসরাতের বিচার শেষবেলায় এসে কোথায় পৌছে বলা মুশকিল। মিডিয়ার কল্যাণে শুনেছি পুলিশের উর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তাও নাকি সোনাগাজীর অভিযুক্ত সেই ওসি মোয়াজ্জাম খানের পক্ষে সুপারেশ করেছেন।

হায়রে মানবতা! কোথায় হারালি? আমরা মানুষ, সৃষ্টির সেরা জীব। সব দিক থেকেই সৃষ্টির সেরা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো একবিংশ শতাব্দিতে এসে আমাদের চলায় বলায়, আদব কায়দায়, আচার-আচরণ, পোশাকে-আশাকে এমনকি ধর্মে কর্মেও মনুষ্যত্বকে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সৃষ্টির সেরা জীবের যেমন বৈশিষ্ট থাকার কথা তা যেনো একেবারেই হারিয়ে বসেছি। সবাই এক প্রকার সুযোগ সন্ধানী হয়ে উঠেছি। আর কয়েকদিন পরেই মুসলমানদের পবিত্র মাস রমজান শুরু হচ্ছে। অথচ পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম বিশ্বে যেখানে এ মাসে নিত্য প্রয়োজনীয় পন্যের দাম পূর্বের চেয়ে কমে যায় আর বাংলাদেশে সেখানে প্রতিটি পন্যের দাম আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে যায়। বলা যায় ধর্মের নাম ভাঙ্গিয়েই সব থেকে বেশি ফায়দা হাসিল করছে একদল সুযোগ সন্ধানী ধর্ম ব্যবসায়ীরা। ধর্ম প্রচার করতে যেয়ে একশ্রেণীর বক্তারা খোদ নিজেরাই ধর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। ইসলামে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে ধর্ম প্রচারকালে কোনোরুপ আর্থিক লাভ গ্রহণ করা যাবে না অথচ আমাদের বক্তা হুজুরদের বছরখানেক আগেই টাকা বুকিং দিতে হয় অন্যথায় সিডিউল পাওয়া যায় না। লাখ লাখ টাকা দিয়ে বক্তা আনতে হয়। ফলে ওয়াজ ব্যবসায় কিছু মৌলবী সাহেবরা এতোটাই লাভবান হয়েছেন যে কেউ কেউ হেলিকপ্টারে করেও ওয়াজ করতে যান।

মানবতা বর্তমান সময়ে আরো একটি জায়গায় চরমভাবে নিগৃহীত ও লাঞ্ছিত। সেটি হলো যেখানেই দেখবেন সেবার নাম দিয়ে কিছু করা হচ্ছে। হাতে গুণে গুটিকয়েক বাদে, প্রমাণ করার আগেই মোটামুটি নিশ্চিতভাবে ধরে নিবেন এখানেই সাধারণ মানুষের সাথে নতুন করে প্রতারণার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। সহজ-সরল মানুষের সাথে প্রতারণার যতগুলো ধাপ থাকে প্রতিনিয়তই আমাদের দেশের শতকরা ৯৫ ভাগ ডাক্তাররা তা অতিক্রম করে থাকেন। লাশের সাথেও তাদের ব্যবসা বন্ধ থাকে না। কথা প্রসঙ্গে যেহেতু সুযোগ পেয়েছি সেহেতু না বলে পারছি না। আমার বাবা মারা গেছেন ৫ বছর হলো। বাবাকে ঢাকা পিজি হাসপাতালের আইসিউওতে ২২ দিন রেখে চিকিৎসা করেছিলাম। প্রতিদিন ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন মতে ঔষুধ ক্রয় করে দিতে হতো। ৪-৫ হাজার টাকার ঔষুধ প্রতিদিন। আমি যে ঔষুধ ক্রয় করে দিতাম সেগুলোর মধ্যে পার্মানেন্ট কালি লাগিয়ে দিতাম। পরেরদিন আবার সেই কালিযুক্ত ঔষুধই আমি মেডিসিন কর্নার থেকে ক্রয় করতাম। অর্থাৎ যে ঔষুধ আমি ক্রয় করে দিতাম ঠিক সেই ঔষুধগুলো আইসিউও থেকে ফার্মেসিতে পাঠাতো। কী দারুণ ব্যবসা! অথচ সৃষ্টিকর্তার পর আমরা সাধারণ মানুষ ডাক্তাদেরকেই জীবনদাতা ভেবে থাকি। পরিবারের কেউ বড় ধরণের রোগে আক্রান্ত হলে ডাক্তারদের বিশ্বাস করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। তারা যেভাবে বলে ঠিক সেভাবেই আমাদের সব করতে হয়। আর এ বিশ্বাসের সুযোগেই ডাক্তাররা তাদের আখের গোছাতে থাকে।

আমাদের দেশের মানবতার বর্তমান যে রুপ দাঁড়িয়েছে তা হলো, নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্তরা যত অসহায়ই হোক না কেনো ঠিক তাদের কাছ থেকেই ফায়দা হাসিল করে নানা শ্রেণীর লোভী মানুষ নামের অমানুষগুলো। ‘কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ’ প্রবাদের সাথে বর্তমানে শতভাগ মিল খোঁজে পাই। কিছুদিন আগে আমাদের গাজীপুরে হঠাৎ করেই ভয়াভহ শীলাবৃষ্টি হয়েছিলো। এতে কৃষকের ফসল ঘরবাড়ি সব এক নিমিষেই তছনছ হয়েছিলো। গ্রামের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষের ঘরের টিনের চাল ফুটো হয়ে যায়। টিন পরিবর্তন ছাড়া পরিবার নিয়ে রাত্রি যাপন অসম্ভব ছিলো। যে কারণে টিন জরুরী ভিত্তিতে পরিবর্তন করতে হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো কালবৈশাখী ওই শীলা বৃষ্টির পরই টিনের দাম বাড়িয়ে দেয় এক শ্রেণীর টিন ব্যবসায়ীরা। টিনের বান প্রতি ৫শ থেকে ৬শ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে রাখে তারা। গ্রামের অসহায় কৃষক পরিবারকে যেখানে সহানুভূতি দেখিয়ে হলেও দাম কিছু কম রাখার কথা সেখানে সুযোগের সৎব্যবহার শুরু করে লোভাতুর ওই ব্যবসায়ীরা।

ঢাকার চক বাজারের কথায় একবার ভেবে দেখুন না কেনো ! যে রাতে আগুণ ধরলো ঠিক তার পরের দিন সারাক্ষণ পুড়া মানুষ উদ্ধার কাজ চলছে, স্বজনদের কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। সারা শহর ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে ঠিক সেই দিনও আমাদের আশেপাশের পিকনিক স্পটগুলোতে নাচাগানা আনন্দ ফূর্তি দেদারছে চলেছে। কাজেই বলা যায় আমরা এখন মানবতার মহাক্রান্তিলগ্নে বাস করছি। মানবতা আজ বিধ্বস্ত।

লেখার শেষান্তে বলতে চাই, মানবতা হারিয়েছে কারণটা খোঁজলে বলতে হয় আমরা আর এখন কেউ সেই সোনার মানুষ নই। মানুষ যেখানে বাস করে ঠিক সেখানেই মানবতা বাস করে। কাজেই এখন থেকে নতুন করে মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখতে হবে। পরবর্তী প্রজন্ম যাতে মানুষ হতে পারে সেই ভাবেই তাদের গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায়, নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায় যেভাবে বোমা হামলা হয়েছে ঠিক সেভাবে প্রতিনিয়তই বোমা হামলাসহ আরো অন্যান্য বিধ্বংসী হামলাও একেরপর এক চলতে থাকবে। চারিদিকে মানুষের চেহেরায় কিছু হায়েনারা বাস করবে, মানব পৃথিবী মহাশ্মশানে পরিণত হবে।

লেখকঃ সোলায়মান মোহাম্মদ
সম্পাদক ও প্রকাশক , আজকের বাংলা খবর ডট কম। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ