,



একদিন ভরা বর্ষায় –

একদিন ভরা বর্ষায়
হুমায়ুন আবিদ

কয়েকদিন ধরে খুব বৃষ্টি। থামার কোন লক্ষণ নেই। আকাশ যেন ফোটা হয়ে গেছে। অনবরত বৃষ্টি আর বৃষ্টি। পুকুর-নদী,খাল-বিল জলে থৈ থৈ। জেলেদের জালে ধরা পড়ছে প্রচুর মাছ। কৃষকরা ক্ষেত খামারে আমন ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত। কোথাও কোথাও আবার বন্যার আর্বিভাব।
বর্ষার এমন মোহনীয় ক্ষণে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানার ‘ মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী সরকারী কলেজের’ ৯২-৯৩ বর্ষের বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নিলো একদিন বর্ষায় শীতলক্ষ্যার ভরা বুকে নৌকা ভাসিয়ে বর্ষার রূপ দর্শন করবে। বন্ধুদের আন্তরিক উদ্যোগ আর আলোচনার মাধ্যমে ১৯ জুলাই ঠিক করা হয় নৌ ভ্রমণের দিন। সুন্দর এবং স্বার্থক নৌ ভ্রমণের আয়োজক হিসেবে দায়িত্ব নিলেন ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা খান রানা এবং কামাল খান।
০৫ জুলাই ডাঃ আকবর হোসাইনের চেম্বারে আবারও নৌ ভ্রমনের বিষয়ে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় যোগদান করেন পুলিশ ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ আলী, ব্যবসায়ী আশরাফ হোসাইন সহ অনেকে।
আয়োজকগণ তাদের সার্বিক প্রস্তুতির চিত্র তুলে ধরলে সবাই তা সন্তোষ্টচিত্তে গ্রহণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১৯ তারিখ সকাল সাড়ে নয় ঘটিকার মধ্যে বরমী বাজার, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী খেয়া ঘাট’ হতে  নৌ ভ্রমণের জন্য প্রস্তুতকৃত নৌকা নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়বো।
দেখতে দেখতে সেই মহেন্দ্রক্ষণ এসে উপস্থিত হলো। আমরা যে যার মতো দূরদূরান্ত থেকে নিদিষ্ট সময়ে উপস্থিত হয়ে আয়োজকদের আয়োজন দেখেতো অভিভূত। বিশাল বড় দু’তলা বিশিষ্ট ময়ূরপঙ্খী নৌকা রংবেরঙের কাগজ,কাপড় আর ফুল দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ঘাটে।  যেনো আগের দিনের রাজা বাদশাদের নৌ ভ্রমণের ব্যবস্থা।
সবাই নৌকায় উঠার পর পরই মাঝিরা নৌকা ছেড়ে দিলো। ভরা নদী।চারপাশে সবুজের সমারোহ।নদীর দুইধার ঘিরে আছে পাট ক্ষেত, ধইঞ্চা ক্ষেত আর কলা গাছের বহর। রুদ্র মেঘের লুকোচুরিতে নদীর পানি কখনও চিকচিক করে উঠে আবার কখনও কালো মেঘের ছায়ায় হারিয়ে যায়।দস্যিদের উঁচু গাছের ডাল থেকে নদীর পানিতে লাফিয়ে পড়ার দৃশ্য দেখে নিজেও শৈশবে হারিয়ে গেলাম।নৌকা ছুটে চলার সাথে সাথে আমরাও বয়সের হিসেব ভুলে ছেলে মানুষী খেলায় মেতে উঠলাম। কেউ গলা ছেড়ে গান গাইতে লাগলো। কেউ গানের তালে হেলেদুলে নাচতে লাগলো।। নদীর দুই ধারের উৎসাহী লোকজন অবাক চোখে দেখতে লাগলেন আমাদের বাঁধভাঙ্গা আনন্দের নৃত্য।নৌকা চলতে চলতে  সহসা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত গানটির কথা মনে পড়ে গেলো-
“ও নদীরে একটি কথা শুধাই তোমারে
বলো কোথায় তোমার দেশ
তোমার নেইকি চলার শেষ! ও নদীরে—।”
নৌকা ত্রিমোহনীর কাছে আসতেই একটি শুশুক ভেসে উঠলে, অনেকে কুমির! কুমির!! বলে হৈচৈ শুরু করলে নৌকার মাঝিরা সবাইকে আশ্বস্ত করে বললেন,এটি কুমির নয় শুশুক ।  শুশুকরা বর্ষার ভরা মৌসুমে বড় নদী থেকে শাখা নদীতে ঢুকে পড়ে।এরা হিংস্র কোন প্রাণী নয়।
কিছুক্ষণপর পাচকরা গ্যাসের চুলায় রান্না বসিয়ে দিলে পোলাও মাংসের ম ম গন্ধে ক্ষুধা যেনো বাড়িয়ে দিতে লাগলো। অবশ্য বাঁধনহারা আনন্দে সবকিছু ভুলে রইলাম।
বেলা একটার ঘটিকার সময় নৌকা এসে ভীড়লো, কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া থানার মির্জাপুর ঘাটে। সবাইকে বলা হলো আশে-পাশে ঘুরাঘুরি করে বেলা দুইটার মধ্যে নৌকায় ফিরে আসতে।
সবাই যথা সময়ে ফিরে আসলে আয়োজকরা বললো, রান্নাবান্না শেষ।এখন আমরা খাওয়া দাওয়ার কাজটা সেরে ফেরতে পারি। সবাই নৌকার মাঝে  বসে পড়লে পাচকরা সবার হাতে-হাতে পানির বোতল,কোল ড্রিংকস আর খাবারের প্লেট পৌছে দিলো।সবাই খাওয়া দাওয়া শেষ করে বেলা পৌনে তিনটার সময় মির্জাপুর ঘাট হতে নৌকা ছেড়ে দিলো ‘চর আলগির’ উদ্দেশ্য।
পৌনে চারটার সময় নৌকা এসে ভিড়লো ‘চর আলগির’ তীরে। ‘চর আলগির’ দুই দিক দিয়ে বয়ে গেছে নদী। মাঝে বিশাল এই চর। চরটির বুক যেনো সবুজ ঘাসের কার্পেট দিয়ে মোড়ানো। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। চরের বুকে রাখাল ছেলেরা গরুর দল ছেড়ে দিয়ে খেলা করছে আপন মনে। ক্লান্ত জেলেরা নৌকা বেঁধে বিশ্রাম নিচ্ছে গাছের ছায়ায়।কখনও দূর থেকে ভেসে আসছে সুমুদুর বাশিঁর সুর।
নৌকা চরে ভিড়তেই আমাদের আনন্দের মাত্রা যেনো দ্বিগুণ বেড়ে গেলো। কেউ ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো । কেউ গোসল আর সাঁতার কাটতে  ব্যস্ত হয়ে পড়লো। কেউ আবার অন্যজনকে ভিজানোর জন্য বোতল ভর্তি পানি নিয়ে তার পিছনে দৌড়াতে লাগলো। ছবি তুলা,নদীর জলে সাঁতার কাটা আর হৈ-হুল্লোড়ে কখন যে একটি ঘন্টা চলে গেলো টেরও পাইনী।
বিকেল পাঁচ ঘটিকার সময় ‘চর আলগি’ হতে নৌকা ছেড়ে দিলো বারইহাটি বাজারের উদ্দেশ্য। এরি মাঝে শুরু হয়ে গেলো হুমায়ুন আবিদের সৌজন্য পনেরটি ছড়া আর কবিতার বইয়ের র‍্যাফেল ড্র। র‍্যাফেল ড্রয়ের মাঝে বন্ধু আকবরের উপস্থাপনায় গান গেয়ে শুনালেন আমিনুল ইসলাম,কাজী আক্তার হোসেন,ফরহাদ হোসেন,লক্ষ্মী রানী,মাহমুদ আল কাওছার বাবু সহ অন্যান্য বন্ধুগণ।
বিকেল ছয় ঘটিকার সময় নৌকা এসে ভিড়লো বারইহাটি বাজার ঘাটে। এখানে জালাল ফকিরের সৌজন্যে বিকালের নাস্তা এবং চা-চক্র শেষ করে আবার রওনা দিলাম বরমী বাজার খেয়া ঘাটের উদ্দেশ্য।
আবার শুরু হলো আর  ডাঃ আকবর হোসাইনের সৌজন্য সবার জন্য সান্ত্বনা পুরস্কারসহ চারটি বিশেষ পুরস্কারের র‍্যাফেল ড্র। র‍্যাফেল ড্র, গান বাজনা আর হৈ-হুল্লোড়ের কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেলো তার খুঁজও নেই। মসজিদ হতে মাগরিবের আজান ভেসে আসতেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসে দেখি, নদীর তীরে কুঁড়েঘর গুলোতে সাঁঝেরবাতি জ্বলছে।পাখিরা দল বেঁধে নীড়ে ফিরছে। রাখাল ছেলে গরুবাছুর নিয়ে মেঠোপথ ধর চলছে নিজ গৃহের উদ্দেশ্য।আমরাও আমাদের গন্তব্যের দিকে এগুতে লাগলাম স্বাভাবিক ভাবে। অবশেষে আনন্দে ভরা স্বপ্নময়ী একটি দিনের পর্দা টেনে সন্ধ্যা সাড়ে সাত ঘটিকায় এসে পৌছলান বরমী বাজার খেয়া ঘাটে। শেষ হয়ে গেলো স্বপ্নের মতো একটি দিনের গল্প। হাজার স্মৃতির রঙে রঙীন সুখময় দিনটির ছবি হৃদয় ফ্রেমে বন্দি করে এগিয়ে চললাম পুরনো পথের চেনা অধ্যায়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ