,



আলেমদের কাছ থেকে কী শিখার কথা আর কী শিখছি!

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন আলেমদের দখলে। খুব চলছে আলেমদের ওয়াজ নছিহত। ফেসবুক খুললেই দেখি একজন আরেকজনকে বকাবকি করছে। কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। এক বক্তা অন্য বক্তাকে বাটপার, ফকিন্নির পুত থেকে শুরু করে যা-তা বলছেন। একজন অন্যজনকে কাফির ও ইহুদীদের দালাল বলে সম্বোধন করছেন। স্টেজে বক্তব্য দেওয়ার সময়ে জুতা উঁচিয়ে অন্য বক্তাকে শাসানোসহ হেন কটুবাক্য নেই যা তারা ব্যবহার করছেন না। খুব খারাপ ভঙ্গিতে অমার্জিত ভাষাও ব্যবহার করতে দেখা গেছে। যেসব ভাষা সাধারণত জেনেরেল শিক্ষিত লোকজনও কখনো ব্যবহার করে না। এমনকি খুব সুপরিচিত এক বক্তাকে ইশারা করে ডক্টরেটধারী অন্য এক বক্তা অন্যের স্ত্রীকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে দিনেরপর দিন ধর্ষণের অভিযোগও এনেছেন। বলা যায় ওয়াজের নামে শুধুই পরচর্চা আর পরনিন্দা দিয়েই পুরো মাহফিল শেষ করছেন।

যে যার সুবিধামত মাছলা-মাছায়েল দিচ্ছেন। ইচ্ছেমতো কুরআন হাদীসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে নিজেদের দল বড় করছেন। কেউ সুন্নী, কেউ শিয়া, হানাফী, রফাধানী, শাফেয়ী, মালিকী, আহলে হাদীস, হাম্বলী, ওয়াহাবী, জমায়াতী, দেওবন্দী তরীকপন্থী, তবলীগপন্থী, যোবায়েরপন্থী, সা’দপন্থী, বাউলপন্থী, লালনপন্থী, সুফিবাদী, নকশাবন্দিয়া, ব্রেলভী, দেওয়ানবাগী, ইলিয়াসী, মওদুদী, কওমীয়া, আলিয়া, ছারছীনা, চরমোনাই, হেফাজতী, আটরশী, কাদেরিয়া, মুজাদ্দেদিয়া, মাইজভান্ডারী, মাজহাবী, লা-মাজহাবী এমন হাজারো মতাবলম্বী রয়েছেন। উল্লেখ্য আমাদের এশিয়া উপমহাদেশের বেশ কিছু ধর্মীয় মতাবলম্বীরা তাদের সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভের আশায় অনেকে বাবাপন্থী। হিন্দু ধর্মে যেমন শুধু মা আর মা। একেবারে মা দিয়ে জয়জয়কার। যেমন- মা সরস্বতী, মা দূর্গা, মা লক্ষ্মী, মা কালী। তেমনই আমাদের ধর্মের কিছু অনুসারীদের কাছে লেংটা বাবা, গাঞ্জা বাবা, তালা বাবা, ফকির বাবা, পাঙ্খা বাবা থেকে শুরু করে লাখো বাবা রয়েছেন। কেউ বলছে শব্দ করে আমিন বলতে হবে, কেউ বলছে আস্তে বলতে হবে। কেউ পায়ে পায়ে পা লাগিয়ে দাঁড়াচ্ছে কেউ আবার দূরে দূরে দাঁড়াচ্ছে। তারাবির নামাজ কেউ ৮ রাকাত পড়ছে কেউ আবার ২০ রাকাত পড়ছে। কেউ দু’হাত উত্তোলন করছে আবার কেউ করছে না। সবাই সবার মতবাদকে সেরা বলে দাবী করছে। এই দল বলছে তাদেরটাই সহীহ্ আবার ওই দল বলছে তাদেরটাই নাকি সহীহ্। সত্যটা হলো সবারটাই কিন্তু এক হওয়ার কথা। যেহেতু আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। আখেরী নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাঃ একজনই। সেহেতু ধর্মীয় নিয়ম কানুন, মাছলা-মাছায়েল সব এক হওয়ারই কথা। প্রকৃতপক্ষে একই। কিন্তু ওই যে কে কিভাবে সুবিধা নিবে সেই ফিকির থেকেই মূলত দিধাবিভক্তি।

এবার আসি জিকিরের কথায়। এটা নিয়ে অবশ্য কথা বলতে এক হুজুর নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, লোকজন লাফালে আপনাদের এতো জ্বলে কেনো? হুজুরের দাবী লোকজন কি সাধে লাফায়! আল্লাহর ইশকে নাকী দেওয়ানা হয়ে এমন লাফায়। ছামিয়ানার নিচে, বাঁশের খুটি বেয়ে ওপরে উঠতে দেখা যায়। অন্য শ্রোতার ঘাড়ে চড়ে বসতেও দেখা যায়। বলা যায় ফানাফিল্লাহ অবস্থা। কী রেখে কী করবে বলা মুশকিল। এক্ষেত্রে ওই হুজুরের দাবীর সাথে সুর মিলাতে হলে মানতে হবে তাদের এ সমস্ত শ্রোতারা নবী রাসূলগণ ও তাঁদের সাহাবীদের থেকেও বেশি আল্লাহওয়ালা। আল্লাহর প্রেমে দেওয়ানা হয়েছেন। ব্যাপারটি কি হাস্যকর! যেহেতু কোনো নবী রাসূল বা তাঁদের সাহাবীদের কাউকে কখনো জিকির করতে করতে এমন উদ্ভট আচরণ করার কোনো হাদীস বা কোরআনী দলীল পাওয়া যায়নি। এই যে আমার ধর্মীয় একখানা মত পেশ করলাম। এইবার হুজুররা আবার বলে বসবেন আমি বড় কোনো আলেম কিনা বা আমার মাদ্রাসা থেকে উচ্চতর কোনো ডিগ্রী আছে নাকী? মুফতী বা মুহাদ্দিস কিংবা মুফাসসির কিনা। এই লেখা কোনো ধর্মীয় বক্তা পড়লে নিশ্চিত এটা নিয়েও চলবে তাদের সমালোচনা ও কুটুক্তি। হ্যা, আমি ধর্মীয় কোনো আলোচক না। ধর্মীয় লাইনের ডিগ্রীধারী কেউ নই। কিন্তু আমাকে বলবেন, ধর্মীয় কোনো মত দিলে মাদ্রাসা থেকে বড় ডিগ্রী থাকতে হবে, না কোরআন হাদীসের সঠিক আকীদার জ্ঞান থাকতে হবে? আরবী গ্রামারে ভালো দক্ষতা থাকলেই কিন্তু কুরআন-হাদীস বিশদরুপে বুঝার যথেষ্ট যোগ্যতা থাকে। যেহেতু কুরআন হাদীস আরবী ভাষায়।

যাক সেসব কথা। আমি তো আর মাছলা-মাছায়েল দিচ্ছি না। আমি খুব সাধারণভাবে বর্তমান সমাজের মৌলবী সাহেবদের করা আমলের ওপর কিছু সোজাসাপ্টা নমুনা লিখতে বসেছি। কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি। মাসখানেক আগে আমাদের গাজীপুরের কালিগঞ্জ উপজেলায় আদিল নামের মাত্র ৪ বছরের নিষ্পাপ এক শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মাদ্রাসা শিক্ষক মো. জোনায়েদ আহমেদের থাকার কক্ষের ওয়ার্ডড্রব থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জানা যায়, শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পরে ওই মৌলবী জমায়াতে নামাজ আদায় করেন এবং মসজিদে বসেই ঘন্টাখানেক কুরআন তেলাওয়াত করেন। মৌলবী সাহেবের মুখে দাঁড়ি ছিলো। পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়তো। সাধারণ মানুষদের কাছে নিয়মিত ওয়াজ নসিহতও করতো। এখন বলুন, এই মৌলবীকে আল্লাহপাক কোথায় রাখবেন? নিশ্চয়ই বলবেন এই মৌলবী দিয়েই আল্লাহপাক জাহান্নামের আগুন ধরাবেন, কুরআনে যা উল্লেখ রয়েছে। তাহলে এবার বলুন তো এই ধরণের মৌলবী কি দেশে আরো আছে, না নাই? বলতে কষ্ট হলেও বলতে হচ্ছে, প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় কোথাও না কোথাও এ সমস্ত তথাকথিত মৌলবিদের কর্মকাণ্ড- সু-বিস্তারে উঠে আসে। কোরআনের আসর থেকে উঠিয়ে নিয়ে অবুঝ শিশুদেরকে এরা ধর্ষণ করে। ধর্ষণ শেষে খুনের খবরও পাওয়া যায়। আলিয়া মাদ্রাসা ও কওমি মাদ্রাসার হুজুরদের এমনও খবর জেনেছি দিনের পর দিন একই সাথে অবুঝ দু’শিশু বোনকে লাগাতার ধর্ষণ করেছে। তথাকথিত মৌলবি বলছি কেনো? যারা মসজিদে ইমামতি করছেন, স্টেজে স্টেজে ওয়াজ করে বেড়াচ্ছেন। সুমধুর কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াত আর আজান দিয়ে লাখো শ্রোতাদের হৃদয় কাড়ছেন। ঠিক তাদের অনেকেই গোপনে মহাপাপে জড়িয়ে নিজেদের নোংরা ও বিকৃত যৌন স্বার্থ চরিতার্থ করছেন। শুধুমাত্র প্রকাশ হলেই আমরা জানতে পারছি। প্রকাশের ঠিক আগমূহুর্তেও এই সমস্ত হুজুরেরা আমাদের কাছে অনেক বড় আলেমই ছিলো। আমাদের আশেপাশে কিছু মৌলবী দেখা যায় সুস্থসবল দেহ অথচ কখনো কাজ করে না। সব সময় অপরের কাছ থেকে চেয়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। কিন্তু তারাই আবার বলে বেড়ায় নবীর শিক্ষা করো না ভিক্ষা। কিছু মৌলবিদের দেখা যায় মাহ্ফিলের নাম করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটিয়ে টাকা উঠায়। তাছাড়া ওয়াজ মাহফিলের নামে যেভাবে চাঁদাবাজী শুরু হয়েছে তা রীতিমত অবাককর বিষয়।

এবারের শীতে এক মাহফিলে ওয়াজ শুনতে গিয়েছিলাম। একজন ওয়াইজেনের পরই হুজুর টাকা কালেকশন শুরু করলেন। হুজুর বললেন ১০ জন লোক চান ১০ হাজার করে। কয়েকজন ধর্মপ্রাণ ১০ হাজার করে দিলেনও। কিন্তু হুজুরের ১ লাখ পূর্ণ হতে আরো লাগে। একপর্যায়ে তিনি বললেন যদি টাকা আপনাদের পকেটে থাকে তাহলে দাবী থাকলো, না দিলে কাল কিয়ামতের ময়দানে এর কঠোর জবাব দিতে হবে। ভেবে দেখুন, বিষয়টা কেমন হয়ে গেলো। এমনও তো হতে পারে চিকিৎসার জন্য বা খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজের জন্য আপনার পকেটে টাকা রয়েছে ওই মুহুর্তে। তাহলে টাকা দিয়ে দিবেন? দানখয়রাত অবশ্যই করতে হবে। তবে নিশ্চয়ই নিজের ওপর জোর জুলুম করে নয়। ওয়াজ মানেই এখন এক প্রকার মহাবাণিজ্যে রুপ নিয়েছে। বাৎসরিক ওয়াজের নাম করে ইচ্ছেমত টাকা তুলছেন ওয়াজ কমিটি। আবার হুজুররাও নির্ধারিত টাকা ছাড়া ওয়াজ করতে আসেন না। নির্ধারিত ফি প্রদান করলেও দেখা যায় অনেক সময় মিস করেন।  ধর্মপ্রাণ মুসুল্লীদের সাথে প্রতারণার করে এক বক্তার কথা বলে অন্য বক্তা উঠিয়ে দেওয়া হয় । অন্যদিকে যেখানে আল্লাহর বানীর বিনিময় আর্থিক লেনদেন নিষেধ সেখানে টাকায় যেনো বক্তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।

বর্তমানে হুজুরদের চালচলন-আচরণ এমন উদ্ভট ও উদ্দেশ্য প্রণেদিত হয়েছে যে শুক্রবারে এলাকার মসজিদে দাঁড়িওয়ালা অপরিচিত কাউকে দেখলেই ভয় হয়। কেমন যেনো একটা আতঙ্ক কাজ করে। অথচ ইসলাম কখনো উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ সমর্থন করেনি। ইসলামের শত্রুরা ইসলামের লেবাস ধরে টুপি-জুব্বা পড়ে দাঁড়ি রেখে ইসলামকে ধ্বংসের পায়তারা করছে। এই ক্ষেত্রে অবশ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সম্প্রতি দুশ্চিন্তার বিষয় হলো জঙ্গিরা ইসলামকে যতটুকু ক্ষতি না করছে তার চেয়েও হাজারগুণ বেশি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে তথাকথিত এ সমস্ত মৌলবি বা ধর্মীয় বক্তারা। সাধারণ মানুষ খুব উদ্বিগ্ন। একজন ইসলামের দাঈ’র ভাষা, আচরণ ও কাজ যদি এমন বেমানান হয় তাহলে তাদের কাছ থেকে কী শিখবে। বরং দিনদিন অধিকাংশ মানুষই ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

শেষদিকে বলা যায়, একজন ইসলাম প্রিয় সচেতন মানুষ হিসেবে সবার মনে রাখতে হবে। যারা যেটা নিয়ে গবেষণা বা কাজ করে, ভুল হলে তারাই সেখানে ভুল করবে এবং সমালোচিত হবে। যেহেতু আলেমদের কাজ ইসলাম নিয়ে চর্চা, গবেষণা এবং প্রচার করা। সেহেতু আলেমরাই এখানে বেশি ভুল করবে। যদিও সমসাময়িক ধর্মীয় বক্তাদের এহেন আচরণে সাংসদরাও মহান সংসদে আলোচনার ঝড় তুলেছেন। এক-দু’জনের ধর্মীয় আলোচনায় হয়তোবা নিষেধাজ্ঞাও জারী হয়েছে। যে কারণে বর্তমান সময়ের তুমুল আলোচিত বক্তা মিজানুর রহমান আল আজহারী তাঁর নির্ধারিত অনুষ্ঠানসূচি বন্ধ করে মালয়েশিয়া চলে গেছেন। সরকারকে মনে রাখতে হবে, এশিয়া উপমহাদেশের ইসলাম চর্চার বিষয়টি সত্যিই খুব স্পর্শকাতর একটি বিষয়। এখানে হুটহাট করে ধর্মীয় কোনো আলোচকের আলোচনা থামিয়ে দেয়া যাবে না, আইনী নিষেধাজ্ঞা জারীর মাধ্যমে। তবে অন্য কোনো ধর্মকে খাটো করা, বা বড় ধরণের কোনো পাবলিক ক্লেশ হয় এমন জায়গায় নিষেধাজ্ঞা জরুরী। কে কার প্রোডাক্ট সেটা বিবেচ্য বিষয় না। বিবেচ্য বিষয় হলো তার দ্বারা দেশ ও দশের কোনো ক্ষতি সাধন হচ্ছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা। যে যার মতো যার যার ধর্মীয় মতবাদ উপস্থাপন করবে, সাধারণ আমজনতা ও ইসলামপ্রিয় মানুষ তাদের জ্ঞানানুযায়ী তা গ্রহণ করবে। কেউ যদি মনে করে অপরে যা প্রচার করছে সেটা বেঠিক তাহলে সে সঠিকটা প্রচার করুক। মামলা-হামলা, আইনী নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যেনো কাউকে থামিয়ে বা কারো কণ্ঠরোধ করা না হয়। এটা বল বা শক্তি প্রয়োগের স্থান নয়। প্রচারকে প্রচার দিয়েই রোধ করতে হবে। অন্যথায় ইসলামের যে মহাক্ষতি হবে তা কখনো পূরণ হবার নয়।

 

লেখকঃ সোলায়মান মোহাম্মদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ